সমুদ্রবন্দর ও জলের ভূরাজনীতি

base_1508397423-big_1331735452

বন্দর নিয়ে ভূকৌশলগত কারণে জটিল হচ্ছে আঞ্চলিক রাজনীতি। গণচীন তার সিল্ক রুটের আওতায় পূর্ব এশিয়ার বন্দরগুলোয় নিজেদের বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে তত্পরতা চালাচ্ছে। চীনা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোর্ডের উদ্দেশ্য হলো, তার বাণিজ্যপথ সুগম ও সম্প্রসারণ করা। এরই মধ্যে চীন ‘স্ট্রিং অব পালর্স’ পলিসির মাধ্যমে এ অঞ্চলের বন্দরগুলোকে ‘মুক্তার মালার’ মতো একত্র করে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃঢ় করতে আগ্রহী। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে চীন পাকিস্তানের গওধর বন্দর ও শ্রীলংকার হাম্বানটোটো বন্দরের কর্তৃত্ব হাতে নিয়েছে। অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের সিল্ক রুটের দাপট মোকাবেলা করার জন্য নরেন্দ্র মোদি প্রাচীন ভারতের সুতি কাপড়ের বাণিজ্যিক রুট হিসেবে নতুন ‘কটন রুট’ বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে আফ্রিকা পর্যন্ত সমুদ্র বাণিজ্যকেন্দ্রিক যোগাযোগ তৈরি হবে। বেইজিং যে মেরিটাইম সিল্ক রুটের স্বপ্ন দেখছে, বাংলাদেশ তার মেরিটাইম এজেন্ডার অন্যতম। গণচীন সরকার বাংলাদেশের সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করার নিমিত্তে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি ছিল। বাংলাদেশ প্রাথমিক চুক্তিও সই করেছিল। পরে ভারতের তীব্র বিরোধিতায় প্রকল্পটি বাদ দেয়া হয়। ভারতের আপত্তিতে সরকার সোনাদিয়াকে বাদ দিয়ে মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর পায়রায় বন্দর পরিকল্পনা স্থানান্তর করে। চীনা হারবার কোম্পানি ও ভারতের আদানি গ্রুপের প্রতিযোগিতায় সোনাদিয়া থেকে সরে আসা আমাদের জন্য কার্যত সফলতা আনবে না। কারণ বাংলাদেশের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দরের উপযুক্ত স্থান ছিল সোনাদিয়া, যার পর্যাপ্ত গভীরতা ও অবস্থানগত সুবিধা আছে, কিন্তু পায়রা গভীর বন্দরের সব শর্ত পূরণ করে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ আমদানি-রফতানি হওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের গভীরতা নয় ফুটের নিচে, যাতে মাদার ভেসেলের মতো ভারী পণ্য আমদানিকারক জাহাজ প্রবেশ করতে সক্ষম নয়। পণ্য খালাস করতে মালয়েশিয়া বন্দরে কনটেইনার জাহাজ পরিবর্তন করতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় বেশি হয়। এ অবস্থায় ভারত সেভেন সিস্টারস রাজ্যগুলোর  জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুবিধা পেতে জোর তদবির করছে, যা বাস্তবিক পক্ষে বাংলাদেশের জন্য কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। মূলত বাংলাদেশে সমুদ্রবন্দর তৈরির ক্ষেত্রে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। চীন, ভারত, জাপান বাংলাদেশে বন্দর তৈরিতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশ বুঝতে পারছে না, কোন মিত্রকে সমুদ্রবন্দরের কাজ  দেবে। শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রকল্প প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে দরকার বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক কূটনীতি ও নেতৃত্ব। বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্ররোচনায় সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সরে আসা বা তা বাতিল করা আমাদের দেশের জন্য কখনো সুখকর হবে না।

জলসীমা নিয়ে সারা বিশ্বে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেড়েই চলছে। জলবায়ু পবিবর্তনে নদীর গতিপ্রবাহ পরিবর্তন হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে ৫৩টিতে বাঁধ, ব্যারাজ, ড্যাম দিয়ে পানি আটকে রেখেছে। পদ্মার উজানে ফারাক্কা, তিস্তার উজানে গজলডোবা বাঁধ, বরাক নদীতে টিপাইমুখ বাঁধ, চেরামন বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে শুষ্ক মৌসুমে পানি থেকে বঞ্চিত করছে, আবার বর্ষাকালে বাঁধ খুলে দেয়ায় মানুষ ব্যাপক বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের শিকার হচ্ছে। এমনকি ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় গঙ্গা-তিস্তা, মানস-সংকোস নদীকে একত্র করে নিজ দেশের মরুসদৃশ অঞ্চলে পানি প্রবাহিত করার  পরিকল্পনা করছে। তাতে বাংলাদেশ বর্ষাকালেও পানি সমস্যায় পড়বে, যা আন্তর্জাতিক হেলসিংকি নীতিমালা, ডাবলিন নীতিমালা ও রামসার কনভেনশনের পরিপন্থী। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনানুসারে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি করছে। কিন্তু তিস্তা, গঙ্গা কোনো চুক্তিই কার্যকর করছে না ভারত সরকার। ফলে প্রমত্তা পদ্মা, যমুনা, তিস্তা ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মরুকরণের পথে। কৃষক ও জেলেরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

উন্মুক্ত বিশ্ববাণিজ্য, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও ভূকৌশলগত কারণে বর্তমানে বিশ্বরাজনীতিতে সমুদ্রবন্দর ও পানির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানিসম্পদ ও সমুদ্রকেন্দ্রিক বিশ্বরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভীতিসংকুল হারে সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

লেখক:  শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়