এই ফুল দেওয়াটাই তাঁদের সান্ত্বনা

5aceb41dd1a55730c8f2b8a77b56928d-5a32145266969

ভোরের আলো তখন কেবল ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু কুয়াশার চাদর পুরো মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ঘিরে রেখেছিল। এই শীতে স্মৃতিসৌধের প্রবেশমুখ থেকে বেশ দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধা ফিরোজা বেগম। গায়ে সাদা চাদর, পরনে সাদা শাড়ি। আজ বৃহস্পতিবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর বেদিতে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছেন তিনি।

ফিরোজা বেগমের সঙ্গে ছিলেন আরেক বৃদ্ধা জমিলা খাতুন। দুজনই স্বামী হারিয়েছেন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে। ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো শহীদদের ২৯টি পরিবারের সদস্যরা আজ এখানে শ্রদ্ধা জানান।

ফিরোজা বেগমের স্বামী শহীদ চুন্নু মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের মালি ছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে ২৫ মার্চ তিনি প্রাণ হারান। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে বাবার বাড়িতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান ফিরোজা বেগম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে এসে আর স্বামীকে পাননি। স্বামীর লাশটাও শনাক্ত করতে পারেননি। শুধু জেনেছেন, আরও অনেকের সঙ্গে মাটিচাপা দেওয়া হয় তাঁর স্বামীকে।

স্বামীর মুখটা শেষবারের মতো দেখতে না পাওয়ার দুঃখ-আক্ষেপ ঘোচেনি ফিরোজা বেগমের। বললেন, ‘প্রতিবছরই আসি। সারা জীবন কষ্ট করলাম। স্বামীর মুখটাও দেখতে পাইনি। এখানে আসি সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য। প্রতিবছরই আসি গ্রামের বাড়ি থেকে।’ তাঁর ছেলে শাহজালাল বলেন, ‘আমার বাবার মৃত্যুর পর আমার মা-ই আমাদের সব ভাইবোনকে মানুষ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদের তালিকায় বাবার নাম থাকলেও সরকারিভাবে কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। আমরাও কোনো সহায়তা পাইনি।’ শাহজালাল বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন।

জমিলা খাতুন এসেছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে। তাঁর সঙ্গে থাকা ছেলে মিন্নত আলী বলেন, তাঁর বাবা শহীদ হাফিজউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রহরী ছিলেন। তিনি একমাত্র সন্তান। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকা অবস্থায় দুই হাজার টাকা সাহায্য দিয়েছিলেন। আর কখনো কিছু পাননি। বাবার নামটাও তালিকাভুক্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছি, সুযোগ পাইনি।’

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির ব্যানারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা লোকজনের মধ্য ছিলেন জগন্নাথ হলের প্রহরী শহীদ সুনীল চন্দ্র দাসের ছেলে দিলীপ কুমার দাস, শহীদ আবদুস সামাদের ছেলে আবু জাফর প্রমুখ।